যে কারণে পদত্যাগ করলেন ব্যারিস্টার রাজ্জাক

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে পদত্যাগ করেছেন ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক। শুক্রবার তার ব্যক্তিগত সহকারী কাউসার হামিদের সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

যুক্তরাজ্য থেকে শুক্রবার সকালে একটি চিঠিতে দলটির আমির মকবুল আহমদের কাছে এই পদত্যাগপত্র পাঠানো হয়। ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক চিঠিতে ১৩টি পয়েন্ট লিখেছেন।

 

এতে তিনি লিখেন, ‘জামায়াত একবিংশ শতাব্দীতে ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় অপারগ হয়ে পড়েছে। এ কথা অনস্বীকার্য যে, জামায়াত স্বতঃস্ফূর্তভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও স্বার্বভৌমত্ব মেনে নিয়েছে। এই দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ডের সাথে জামায়াত প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত নয়। গত শতাব্দীর ৮০ এর দশকে ৮-দল, ৭-দল ও ৫-দলের সাথে জামায়াত যুগপৎভাবে রাজপথে সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে। দলটির এ সকল অসামান্য অবদান ৭১-এ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তার ভুল রাজনৈতিক ভূমিকার কারণে স্বীকৃতি পায়নি। ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা পরবর্তীকালে জামায়াতের সকল সাফল্য ও অর্জন ম্লান করে দিয়েছে। এসব কারণে আমি সবসময় বিশ্বাস করেছি এবং এখনও করি যে, ৭১-এ মুক্তিযুদ্ধে নেতিবাচক ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়া শুধু নৈতিক দায়িত্বই নয় বরং তৎপরবর্তী প্রজন্মকে দায়মুক্ত করার জন্য অত্যন্ত জরুরি কর্তব্য।’

 

তিনি আরও লিখেছেন, ‘স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর আজও দলের নেতৃবৃন্দ ৭১-এর ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাইতে পারেনি। এমনকি মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ প্রসঙ্গে দলের অবস্থানও ব্যাখ্যা করেনি। তাই অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় এখন ৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জামায়াতের ক্ষতিকর ভূমিকা সম্পর্কে ভুল স্বীকার করে, জাতির কাছে নিজেদের সেই সময়কার নেতাদের পক্ষ থেকে ক্ষমা চেয়ে পরিষ্কার অবস্থান নেয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।’

ব্যারিস্টার রাজ্জাক লিখেন, ‘আমি বিগত প্রায় দুই দশক নিরবিচ্ছিনড়বভাবে জামায়াতকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি যে, ৭১-এ দলের ভূমিকা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হওয়া উচিত এবং ওই সময়ে জামায়াতের ভূমিকা ও পাকিস্তান সমর্থনের কারণ উল্লেখ করে জাতির কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাওয়া উচিত। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় আমার তিন দশকের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।’

 

তিনি আরও লিখেছেন, ‘বিগত বছরগুলোতে মুসলিম বিশ্বে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। কয়েকটি দেশে ইসলামি মূল্যবোধের ভিত্তিতে গঠিত মধ্যমপন্থি দলগুলো সফলতা অর্জন করেছে। এই পরিবর্তনের বাতাস যদিও এখন পর্যন্ত ১৭ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশের গায়ে লাগেনি কিন্তু সময় এসেছে আমাদের পূর্বপুরুষের তৈরি ইসলামি রাষ্ট্রের ধারনায় কোনো পরিবর্তন আনা যায় কিনা তা নিয়ে নতুন প্রজন্মের গভীরভাবে চিন্তা করার। বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের আওতায় ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে একটি গণতান্ত্রিক দল গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। সময়ের সে দাবি অনুযায়ী জামায়াত নিজেকে এখন পর্যন্ত সংস্কার করতে পারেনি।’

 

ব্যারিস্টার রাজ্জাক লিখেছেন, ‘অতীতে আমি অনেকবার পদত্যাগের কথা চিন্তা করেছি। কিন্তু এই ভেবে নিজেকে বিরত রেখেছি যে, যদি আমি আভ্যন্তরীণ সংস্কার করতে পারি এবং ৭১-এর ভূমিকার জন্য জামায়াত জাতির কাছে ক্ষমা চায় তাহলে তা হবে একটি ঐতিহাসিক অর্জন। কিন্তু জানুয়ারি মাসে জামায়াতের সর্বশেষ পদক্ষেপ আমাকে হতাশ করেছে। তাই পদত্যাগ করতে বাধ্য হলাম। এখন থেকে আমি নিজস্ব পেশায় আত্মনিয়োগ করতে চাই।’

 

Leave A Reply

Your email address will not be published.